ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রে সংরক্ষিত সোনা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নিজেদের দেশে বা তুলনামূলক নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। চলতি সপ্তাহে নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ডিএনবি) উত্তর আমেরিকা থেকে ৮৬ টন সোনা লন্ডনের ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে স্থানান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ডিএনবি জানিয়েছে, গুরুতর সংকট মোকাবিলায় নিজেদের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত রাখাই এই স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সোনার মজুদ এমন স্থানে রাখা হচ্ছে, যাতে সংকটের সময় তা সহজে ও দ্রুত ব্যবহার করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোনা সরিয়ে নেওয়া নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপকে অবিলম্বে বড় কোনো অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বাণিজ্য যুদ্ধ, সামরিক সংঘাত ও বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের পরিবর্তন নতুন নয়।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ফ্রান্স জানিয়েছিল, তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের সোনার মজুদের একটি অংশ নিজ দেশে ফিরিয়ে এনেছে। এর আগে জার্মানির বুন্দেসব্যাংক ২০১৬ সাল পর্যন্ত কয়েক বছর ধরে বিদেশে সংরক্ষিত ২১৬ টনেরও বেশি সোনা নিজেদের হেফাজতে নিয়ে আসে। এর মধ্যে ১১১ টন নিউইয়র্ক এবং ১০৫ টন প্যারিস থেকে আনা হয়েছিল।
গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা বিশ্লেষক লিনা থমাস ও ড্যান স্ট্রাইভেন বিবিসিকে জানান, স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও ইউরোপের কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের গচ্ছিত সোনার একটি অংশ নিউইয়র্কে সরিয়ে নিয়েছিল। ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোনা সরিয়ে নেওয়াকে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি কৌশল হিসেবেও দেখা যায়।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সিনিয়র মার্কেট স্ট্র্যাটেজিস্ট জোসেফ কাভাতোনির মতে, যুদ্ধ ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা এসব সিদ্ধান্তে কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটিই একমাত্র বা প্রধান কারণ নয়। মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার এবং সংকটের সময় সহজে সোনা কেনাবেচা বা লেনদেন করা যায়—এমন স্থানে সম্পদ রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
কাভাতোনি মনে করেন, বড় কোনো বিপর্যয় একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এমনটা নয়। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন তাদের সংরক্ষিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা, মজুদ বৃদ্ধি এবং সংকটের সময় সেগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার নিয়ে আগের চেয়ে বেশি সচেতনভাবে চিন্তা করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা নিয়ে এত আলোচনা হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, তারা সাম্প্রতিক সময়ে রেকর্ড পরিমাণে সোনা কিনছে। তবে নিজেদের দেশে সোনা সংরক্ষণেও বাড়তি খরচ রয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকদের মতে, ভৌত নিরাপত্তা, নিয়মিত অডিট অবকাঠামো ও বীমা সুরক্ষায় বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত ছোট কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য এসব অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোনা সরিয়ে নেওয়ার সাম্প্রতিক প্রবণতা ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও স্বর্ণ মজুদের কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
আরও আন্তর্জাতিক সংবাদ পড়ুন: আন্তর্জাতিক সংবাদ














