রাজশাহীর মোহনপুরের একটি পরিবার কয়েক বছরের ব্যবধানে ক্যানসারে হারিয়েছে বাবা ও তিন ছেলেকে। পরিবারের বেঁচে থাকা বড় ছেলে চতুর্থ পর্যায়ের কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত। একই পরিবারের আরও দুই সদস্য হেপাটাইটিস-বিতে আক্রান্ত। এর মধ্যে ক্যানসারে মারা যাওয়া এসারুল ইসলামের স্ত্রী ঝরনা বেগমও চতুর্থ পর্যায়ের ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। ক্যানসারে আক্রান্ত পরিবারটির সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখন মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় পাঁচ বছরের জুনায়েদ ও ১১ বছরের ইসরাতের ভবিষ্যৎ।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ঘাষিগ্রাম ইউনিয়নের আতানারায়ণপুর গ্রামের পরিবারটি একসময় সচ্ছল ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু একের পর এক মৃত্যু এবং দীর্ঘ চিকিৎসার ব্যয়ে পরিবারটি এখন ঋণগ্রস্ত। চিকিৎসার খরচ মেটাতে জমি বিক্রি ও বন্ধক রাখতে হয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, আব্দুল হামিদ ২০২২ সালে লিভার ক্যানসারে মারা যান। এর আগে ২০২০ সালে একই রোগে মারা যান তার ছেলে সাদরুল ইসলাম। ২০২৪ সালে লিভার ক্যানসারে মারা যান সেজ ছেলে মামুন অর রশিদ। এর পরের বছর মারা যান আরেক ছেলে এসারুল ইসলাম। এভাবে ক্যানসারে আক্রান্ত পরিবারটি পরপর চারজন স্বজনকে হারিয়েছে।
এসারুল ইসলামের স্ত্রী ঝরনা বেগম বর্তমানে চতুর্থ পর্যায়ের ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত। ব্রেন স্ট্রোকের পর তার ডান হাত-পা অবশ হয়ে গেছে এবং কথা বলতেও সমস্যা হয়। নিয়মিত কেমোথেরাপি চলছে। ঢাকায় মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারও হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও এক হাত দিয়ে রান্না করে সন্তানদের দেখাশোনা করার চেষ্টা করছেন তিনি।
ঝরনা জানান, স্বামী এসারুলের চিকিৎসায় চারবার ভারতে যেতে হয়েছে এবং প্রায় ২০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। শেষবার চিকিৎসকেরা তার স্বামীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। ভারতে অবস্থানকালেই তিনি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং পরে তার মস্তিষ্কে ক্যানসার শনাক্ত হয়। স্বামীর মৃত্যুর মাত্র এক মাস পর তার নিজের ক্যানসার ধরা পড়ে।
পাঁচ বছরের জুনায়েদ স্কুল থেকে ফিরে মাকে কাজে সাহায্য করে। আর ১১ বছরের ইসরাত অনেক সময় আগের দিনের তরকারি দিয়ে ভাত নিয়ে স্কুলে যায়। মায়ের চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৮ হাজার টাকার ওষুধ প্রয়োজন। অর্থের সংকটে অনেক সময় ওষুধ খাওয়াও বন্ধ রাখতে হয়। মানুষের সহায়তা ও সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেই চলছে পরিবারটি।
পরিবারের আরেক সদস্য শফিকুল ইসলাম, এসারুলের বড় ভাই, নিজেও চতুর্থ পর্যায়ের কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত। অস্ত্রোপচারের পরও তার চিকিৎসা চলছে। তিনি জানান, বাবা ও পরপর তিন ভাইকে ক্যানসারে হারানোর পর এখন নিজেকেও একই রোগের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। ক্যানসারে আক্রান্ত পরিবারটির চিকিৎসায় এ পর্যন্ত প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে স্বজনেরা দাবি করেছেন।
পরিবারের ছোট ছেলে আনোয়ার হোসেন ও বড় মেয়ে রাশেদা হেপাটাইটিস-বিতে আক্রান্ত। আরেক সদস্য হাবিবা খাতুন পেটের আলসার ও পিত্তথলির পাথরে ভুগছেন। ছোট দুই বোন নাসিমা ও ফারহানা এখনো সুস্থ থাকলেও পরিবারের একের পর এক ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় তাদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
মোহনপুর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় জানিয়েছে, পরিবারটিকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে এবং রোগী কল্যাণ ফাউন্ডেশন থেকে কিছু ওষুধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুই শিশুর ভবিষ্যৎ বিবেচনায় প্রয়োজন হলে রাজশিয়ার এসওএস শিশু পল্লীর সঙ্গে যোগাযোগের প্রস্তুতিও রয়েছে।
একসময় যে বাড়িতে পাঁচ ভাইয়ের পরিবার নিয়ে ছিল কোলাহল, সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। চিকিৎসার ব্যয়, ঋণ, স্বজন হারানোর শোক এবং অসুস্থতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় রয়েছে বাবা হারানো ইসরাত ও জুনায়েদের ভবিষ্যৎ। ক্যানসারে আক্রান্ত পরিবারটির আকুতি—অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার পাশাপাশি যেন দুই শিশুর পড়াশোনা ও শৈশবও হারিয়ে না যায়।
আরও খবর পড়ুন: আন্তর্জাতিক সংবাদ
সর্বশেষ আপডেট পেতে যুক্ত থাকুন: YouTube Community















